শ্রীপুরে বেপরোয়া শিক্ষা কর্মকর্তা, নিজ কর্মস্থলে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি


Admin   প্রকাশিত হয়েছেঃ   ৬ আগস্ট, ২০২১

গাজীপুর প্রতিনিধি:গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসান। এই শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান কর্মস্থল ও এর আগে গাজীপুর সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার থাকার সময় ব্যাপক ঘুষ-বাণিজ্য, নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়ম করে শূন্য থেকে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন তিনি।

এ কর্মকর্তা এখন কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। নামে-বেনামে একাধিক জায়গায় জমিজমা ক্রয় করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। শ্রীপুরে কর্মরত রয়েছেন ২০১৭সাল থেকে। দীর্ঘদিন যাবত শিল্পাঞ্চল গাজীপুর জেলায় কর্মরত থেকে তিনি কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। শ্রীপুরেই তার সম্পদের পরিমাণ ছাড়িয়ে যাবে তিন কোটি টাকারও উপর। একজন সরকারী কর্মকর্তার এতো সম্পদ গড়ে তোলায় স্থানীয়রাও এখন বিস্মিত। শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে তার এ সম্পদের খোঁজ মিলেছে।

প্রশাসনিক কাজে তার কার্যালয়ে গেলে শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। বেশিরভাগ শিক্ষক মুখ বুজে সহ্য করেন, কেউ টাকা নেয়ার কারণ জানতে চাইলে নিজের অফিস খরচ এবং উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস ম্যানেজের কথা বলেন ওই কর্মকর্তা।

উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয় সংস্কার কাজের জন্য (শ্লিপের অর্থ) প্রত্যেক বিদ্যালয়ের অনুকূলে হাজার হাজার টাকা অর্থ বরাদ্দ আসে। এসব অর্থ উত্তোলন করতে বিদ্যালয়প্রতি কয়েক হাজার টাকা করে ঘুষ আদায় করেন কামরুল হাসান।

এসব অসৎ কাজ খুব সহজেই সম্পন্ন করতে পারেন উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে। গুটিকয়েক প্রধান শিক্ষক দালাল হিসেবে কাজ করেন। বিনিময়ে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নেন শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য মতে, তিনি নিজ নামে শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া পশ্চিম খন্ড গ্রামে (দারগারচালা) তিনি শ্রীপুর উপজেলা সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে ১৫০৯১/১৬, ৮২৩৬/১৩, ১১৫৫৬/১৩, ৪১৩৩/১৫, ৮১৮৭/১৭, সহ আরো ভিন্ন ভিন্ন দলিলের মাধ্যমে প্রায় ৭০শতাংশ জমি কিনেছেন। উক্ত জমি শ্রীপুর উপজেলা ভূমি অফিসে নিজ নামে নামজারীও করেছেন। এর জোত নং যথাক্রমে ২২৪৩০, ১৯৩২২, ১৯১৩৯, ২৩৩৬৭, ২৩৫৫২। দলিলে থাকা তথ্য অনুযায়ী তার নাম কামরুল হাসান, পিতার নাম হাসান আলী, ঠিকানা উত্তর কাফরুল ঢাকা। সড়ক সংলগ্ন স্থানে কয়েকটি প্লটে কেওয়া মৌজায় তিনি স্থানীয় মহর আলী ও মাকাদুল ইসলামের কাছ থেকে ৩২শতাংশ, জালাল উদ্দিন গংদের কাছ থেকে ১২ শতাংশ, শাহজাহান গংদের কাছ থেকে ১৭.৫০ শতাংশ, জয়নাল গংদের কাছ থেকে ১৭.৫০ শতাংশ জমি কিনেছেন। এছাড়াও উপজেলার বারতোপা এলাকায়ও বেশ কিছু জমি রয়েছে তার। ক্রয় করা এসব জমিতে সীমানাপ্রাচীর নির্মান করে ফটক লাগিয়ে রেখেছেন। সম্প্রতি তার এসব জমির বিষয়ে খোঁজ হওয়ায় অর্ধকোটি টাকায় একটি প্লট বিক্রি করেছেন, বাকীগুলোও বিক্রি করার প্রস্ততি নিয়েছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, শ্রীপুর পৌর শহরে কেওয়া পশ্চিম খন্ড গ্রামে শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসানের এসব জমির প্রতি শতাংশের মূল্য প্রায় ৫-৭ লাখ টাকা। সে হিসেবে শ্রীপুরে কেওয়া মৌজায় থাকা তার জমির মূল্য হবে তিন কোটি টাকার উপর। একজন সরকারী কর্মকর্তার কর্মরত স্টেশনে এতো সম্পদের উৎস্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে সর্বত্রই।

স্থানীয় মহর আলী বলেন, তিনি প্রতি শতাংশ ৩লাখ টাকা করে শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান তার কাছ থেকে ৩২শতাংশ জমি কিনেছেন। বর্তমানে এই প্লটটির দাম কোটি টাকার উপরে হবে।

শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থেকে উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বই কিনতে বাধ্য করেন। পরে ২০১৮সালের দিকে উচ্চ আদালত রুল জারী করলে তিনি দেশের বাহিরে চলে যান। এক বছর পর ফের শ্রীপুরে যোগদান করেন তিনি।

প্রধান শিক্ষকরা জানান, প্রতিবছর উপজেলা শিক্ষা অফিসের উদ্যোগে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ও সরকারি নানা কার্যক্রম পালন করার জন্য সরকারিভাবে নির্দেশনা রয়েছে। একটি কার্যক্রমের জন্য সরকার প্রতি উপজেলায় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। জাতীয় এসব দিবসে বরাদ্দকৃত বেশিরভাগ অর্থ আত্মসাৎ করেন তিনি।

অপর একজন প্রধান শিক্ষক জানান, বিদ্যালয় শিশুবান্ধব করা ও সাজসজ্জার জন্য ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি খাত থেকে প্রতি বছরই মোটা অঙ্কের অনুদান এলেও কতিপয় অসৎ শিক্ষকের যোগসাজশে তেমন কোনো কাজ না করে বরাদ্দের সিংহভাগ টাকাই লুটেপুটে তিনি। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের (করেসপন্ডিং স্কেল) উন্নীত বেতনের জন্য প্রায় লাখ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ আসে। এসব অর্থ উত্তোলন করতে প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে শতকরা হারে রেখে দেন।

ছাত্রছাত্রীদের উপবৃত্তির টাকা ডিজিটাল জালিয়াতি করে আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের নামে বাধ্যতামূলকভাবে মোটা অঙ্কের টাকার খাম আদায় ও দামী উপহার সামগ্রী নেওয়া তার কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

কেবল ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম নয়; শিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও তাদের ব্যক্তিগত নানা কাজে ব্যবহার করারও অভিযোগ পাওয়া গেছে কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে। শিক্ষকদের নানাভাবে হেনস্তা করলেও কোনো শিক্ষক হয়রানির ভয়ে তা প্রকাশ করেন না। শিক্ষকরা তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এমনকি যে শিক্ষকরা তার এসব অপকর্মের খবর ফাঁস করেছেন তাদের দেখে নেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন এই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।

মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, আমার বাবার পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে আমি জমি ক্রয় করেছি, এছাড়া আমার স্ত্রী চাকরি করে তার টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করেছি। অপর এক শিক্ষা কর্মকর্তা তার পাশেই জমি ক্রয় করেছেন বলে জানান। তবে জমি কেনার টাকার উৎসের বিষয়ে তিনি কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, এ বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই।